শিকল ও সমস্যা – ইন্দ্রদত্তা বসু

এক যে ছিল রাজা। রাজ্যে প্রজারা শান্তিতে থাকে। হাসে। গান গায়। গল্প লেখে। কবিতা বলে। ভালোবাসে। ভালোবাসায়। জলছবির দেশে রাত জেগে নৌকা বানায়। ভাসিয়ে দেয় গাঙের জলে, আবার ফিরে আসে তীরের কাছে। ঘুড়ি ওড়ায় নীল আকাশে, কালবোশেখের পর কাঁচা আম কুড়ায়। মালি তেড়ে আসে না। গাঁয়ের পন্ডিত আর পাড়ার কুমোর একসাথে বসে চেটেপুটে তালনবমীর নেমন্তন্ন খায়। তারপর দু’ জন মিলে মেঘ আঁকে চাঁদকিনারে, ফানুস ওড়ায় পূর্ণিমায়।
বাঁচে, বাঁচায়।
রাজা হঠাৎ নতুন নতুন নিয়ম-কানুন চালু করলেন। মন্ত্রীরা খুবই সক্রিয়, নিয়ম দেশের ঘরে ঘরে, রাস্তার প্রত্যেক মোড়ে, নলকূপ, আবহাওয়া দপ্তর, আপিস-কলেজ, রানওয়ে, আষাঢ়ে মেঘ, ল্যাম্পপোস্ট – সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে দিতে একটুও সময় নষ্ট করেননা। মন্ত্রীদের তৎপরতায় যারপরনাই আহ্লাদিত রাজা। তারা ঘুমায় না, খায় না, বৃষ্টি দেখে না, রোদ মাখে না – কেবল ছুটে বেড়ায়। নিয়মের বোঝা বয়ে। ছড়িয়ে দেয় মুঠো মুঠো – চারদিকে। তবু নিয়ম কখনো কম পড়ে না, বস্তা বোঝাই নিয়ম আছে হরেকরকম। রাত জেগে তারা নিশ্ছিদ্র পাহারা দেয়, কেউ নিয়ম এড়ালেই কোপ। নিয়ম কাউকে ছাড়বে না, কিন্তু কেউ যদি নিয়ম ছাড়ে? অতএব চোখ রাঙানি আর সাইরেন। থেকে থেকে। অবিরাম। পাছে রাজা সাজা দেয়?
এসব নিয়ম শ্যাওলার মতো জন্মায়, বেড়ে ওঠে চারদিকে। মানুষের পা পিছলে যায়, চোখ গেলে যায়, হাত ছড়ে যায়, পা কেটে যায়, দমবন্ধ হয়ে আসে, “গেল গেল” রব ওঠে তবু কি গেল আর কি এল, বুঝতে পারেনা। তারা নিয়ম মানে নিয়ম করে। পাছে রাজা সাজা দেয়?
এসব নিয়েও দিব্যি চলছিল। অগাধ জ্যামিতি। মাপে মাপে জীবন, বাক্সে বাক্সে মানুষ। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় দিন-রাত, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত। মন্ত্রীদের আয় বাড়ছে, ভুড়ি বাড়ছে। কিন্তু, গোল বাঁধল তখন, যখন একটা রোগা মতো মেয়ে, হঠাৎ বলে বসল – “না।”
সে কি? এ কেমন কথা? নিয়মে বলে, “না” বলা যাবে না। ওটা নিষিদ্ধ, পাছে রাজা সাজা দেয়?
কিন্তু তারপর সেটা ছড়িয়ে গেল দাবানলের মতো। চারপাশ থেকে হঠাৎ শোনা যেতে লাগল – “না না না না”। কোনোটা ফিসফিসিয়ে, কোনোটা জোরে। কোনোটা একবার, কোনোটা বারবার। জ্যামিতি গেল ভেঙে। নিয়ম গেল গুলিয়ে।
রাজা সাজা দিল – শিকল উঠলো “না”-দের গলায়‌। তারপর শিকল ছড়িয়ে গেল ঘরে ঘরে, রাস্তার প্রতি মোড়ে, নলকূপ, আবহাওয়া দপ্তর, আপিস-কলেজ, রানওয়ে, আষাঢ়ে মেঘ, ল্যাম্পপোস্ট – সমস্ত জায়গায়। মানুষ এখন শিকল খায়, শিকল পড়ে, শিকল লেখে, শিকল দেখে, শিকল শেখে, শিকল বলে। জন্মালে শিকল, মরলে শিকল। ভূত দেখলে শিকল, শিকল দেখলে ভূত। শিকল ছাড়া মানুষ অন্ধ, পথ চেনে শিকল দিয়ে। বড়-ছোট-লম্বা-বেঁটে-ভারী-হালকা-লাল-কালো…
শিকল, শিকল, শিকল!
এবার আসি বর্তমানে। বর্তমানে দেশের নাম শিকল, রাজার নাম শিকল, আইনের নাম শিকল, ইস্কুলের নাম শিকল, আকাশের নাম শিকল, বাবার নাম শিকল, মায়ের নাম শিকল, আমার নাম শিকল। আমরা শিকল ছাড়া চলি না, আমরা শিকল ছাড়া নড়ি না।
প্রথম প্যারার পর, শিকলের একটা লম্বা ইতিহাস বয়ে গেছে। ইতিহাসটা এতই লম্বা যে আমরা আর জানিনা প্রথম প্যারাটা সত্যি কিনা। ওই ইতিহাসটা আমরা বর্তমানের মজ্জায় মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছি নিখুঁতভাবে – যাতে কোন ফাঁক না থাকে। আমরা আর জানিনা নিয়মের আগে কিছু ছিল কিনা, শিকল ছাড়া কিছু ছিল কিনা। কারণ এখন আমরা শিকল দিয়ে সাজি, শিকল দিয়ে গয়না বানিয়ে সেই গয়না পরি। যে শিকলের জাঁকজমক বেশি, বাজারে তার দাম বেশি – সবাই কিনতে পারেনা। যার শিকল যত ভারী, তার কদর তত বেশি। সমাজে তার খুব নামডাক। নিজের শিকল দেখিয়ে সে ছাতি ফুলিয়ে চলাফেরা করে আর চারপাশে মানুষ তাকে বলে –
“আহা, এ কি দেখলাম। লোকটার কি এলেম! ইনিই শ্রেষ্ঠ।”
শিকল আমাদের সাজ। শিকল পরলে আমার পড়শী বলে আমায় সুন্দর দেখায়।
এবার বুঝলেন সমস্যাটা কোথায়?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.