প্রসঙ্গে মৌমাছি ও মধু – পর্ব ২ – সুকন্যা দত্ত

আজ প্রাচীন মিশরে মধু ও মৌমাছির গুরুত্ব নিয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

প্রাচীন মিশরে সমাজের উচ্চ-নিম্ন সকল শ্রেণীর মানুষ মধু পান করতো, যার থেকে ধারণা করা হয় হয়তো সেই সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে মধুর চাষ হতো।হায়ারোগ্লিফিক্সে মধু এবং মৌমাছি সংগ্রাহকের বহু ছবির উদাহরণ পাওয়া যায়। প্রায় চার থেকে সাড়ে চার হাজার বছর ধরে মিশরীয়দের মধ্যে একই পদ্ধতিতে মৌমাছি সংরক্ষনের প্রথা প্রচলিত হয়ে আসছে। নীল নদের কাদামাটি বা  মাটির তৈরি সরু নলে মোমের অবশিষ্টাংশ, মৌমাছির পাখনা, মধুর ফোঁটা থেকে অনুমান করা যায়, সেই নলগুলিতে  মৌচাক সংরক্ষণ করে রাখা হতো। একের পর এক নল স্তূপ করে রাখা হতো এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনে তাদের স্থান পরিবর্তন করা হতো। পরাগ সংযোগের জন্য মৌমাছিদের ফুলের উপর ছেড়ে দেওয়া হতো এমনকি একটি বিশিষ্ট ভেলা তৈরি করা হয়েছিলো মৌচাককে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। নতুন নতুন স্থানে ফুলে পরাগ সংযোগের জন্য মৌমাছি নিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার ফুলগুলো শুকিয়ে গেলে আরও দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। এইভাবে মিশরের প্রায় সকল অংশেই মৌচাক নিয়ে মৌমাছি পালকরা ঘুরে বেড়াতো।

প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসায়, ক্ষত নিরাময়ের জন্যই মধুর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন মিশরের একটি বিবাহের পত্র পাওয়া যায়, যেখানে স্বামীর বয়ানে লেখা ছিলো –
“আজ থেকে আমি তোমাকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করলাম এবং বছরে ১২ বোতল মধু দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলাম।”

মিশরী বিজয়ী দেশগুলি পরাজিত দেশের থেকে মধু আদায় করতো। সিরিয়ার রেটেনু উপজাতির কথা জানা যায়, যারা বিজয়ী দেশকে মধু উপহার দিতো।মিশরের মমিগুলিকে মধু দ্বারা লেপন করার পর সাককোফাগি বা পাথরের কফিনে বন্দী করা হতো এবং সেগুলি মোম দিয়ে আটকানো হতো। মিশরীয় সমাধিতে মধুর শিশি রেখে আসার কথাও জানা যায়। অনুমিত, মৃত্যু পরবর্তীতে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হওয়ায় তারা এই কাজ করতো।

‘Salt Magical Papyrus’ এ উল্লেখ করা হয়েছে, পৃথিবী ও সমুদ্রের সৃষ্টিকর্তা মিশরীয় সূর্যদেবতা ‘রা’-এর চোখের জল থেকে মৌমাছির সৃষ্টি হয়েছে। ‘রা’- এর চোখের জল মাটিতে পড়তেই মৌমাছির জন্ম হয় এবং তারা ফুলের উপর বসে এবং এই মৌমাছিরাই হলো পৃথিবীর মধু ও মোমের উৎস।  মিশরের দেবী নেইথ যে উপাসনালয়ে পূজিত হন সেটি  ‘The  House of the bee’ নামে পরিচিত। প্রাচীন যুগে মিশরীয়দের মৃত্যু পরবর্তী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ‘Opening of the Mouth’ এ পুরোহিতরা বিশিষ্ট কোনো রাজার মমির মূর্তি বা ঈশ্বরের মূর্তিকে একটি পাত্র দ্বারা মধু পান করাতেন। তাদের আরও বিশ্বাস ছিলো, মৃত্যুর পর আত্মা মৌমাছির রূপ ধারণ করবে। আর একটি তথ্য পাওয়া যায় ‘Am-Tuat’ বা ‘Otherworld’ গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর আত্মার যে স্বর তা অনেকটা মৌমাছির গুঞ্জনের মতো। 

প্রাচীন মিশরে প্রসাধনে, ছবি অঙ্কনের ক্ষেত্রে মোম ব্যবহারের প্রচলন ছিলো। এমনকি কালো যাদু বিদ্যার বিশ্বাস অনুযায়ী সে দেশের মানুষ মনে করতো, কোনো ব্যক্তির আদলে মোম দিয়ে পুতুল নির্মাণ করে তাতে আঘাত করলে, সেই ব্যক্তির মৃত্যু হবে।

লেখক পরিচিতি :- সুকন্যা দত্ত ব্যারাকপুরের নিবাসী, পেশায় হাই স্কুলের শিক্ষিকা।

Copyright © Kothabriksha 2020, All Rights Reserved

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.