মানিকতলা ঘোষ বাড়ির দুর্গোৎসব – কথাবৃক্ষ শারদীয়া সংখ্যা, ২০২১

“আমাদের প্রতিমার বিশেষত্ত্ব হল মটচৌরি চালা, তিনটে আলাদা আলাদা চালা থাকে প্রতিমার পেছনে, বলা যায় বাংলার যে মূল চালচিত্র সেটা আমাদের বাড়ির প্রতিমায় ব্যবহার করা হয়”।

সরু অথচ আত্মবিশ্বাসী গলার আওয়াজ আমাদের মনযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। কৌতূহলী হয়ে ফিরে তাকাতেই দেখতে পাই সেই ছোট্ট মাপের জ্ঞানী মানুষটিকে।

আমরা কথা বলছিলাম বিবেকানন্দ রোডের ঘোষ বাড়ির ঠাকুরদালানে বসে শ্রীমতি মিঠু ঘোষের সাথে। কথাবৃক্ষ সাহিত্য পত্রিকার শারদীয়া প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহের সাথে সাথে শহর কলকাতার পুরনো গন্ধ মাখা বাড়ির ঐতিহ্যের সম্ভারে সমৃদ্ধ হওয়া ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য। লাল রঙের বাড়িটির আদল, গঠন, বাড়িতে ঢোকার মুখে দুধারে দারোয়ানের বসার জায়গা, বারান্দা, খড়খড়িওয়ালা জানলা আর সরু প্রবেশদ্বার পেরোতেই ঠাকুরদালান – এ সব কিছুই বাড়িটির প্রাচীনত্বের হিসেব পেশ করে খুব সহজেই। ঠাকুরদালানের ডানদিকে সিঁড়ি উঠে গেছে মা দুর্গার স্বপরিবারের বাৎসরিক বাসস্থানে। এখানেই প্রতি বছর মায়ের পুজো হয় দূর্গাপুজোর দিনগুলিতে। দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এমব্লেম কলকাতার বনেদী পরিবারগুলির সাহেব আনুগত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ঘোষবাড়ির ঠাকুরদালান

শ্রীমতী ঘোষের থেকেই সার্ধশতাব্দীরও বেশী প্রাচীন এই বাড়ির পুজোর গল্প শুনছিলাম। গিরিশচন্দ্র ঘোষ ১৮৫৬ সালে হুগলীর পরঞ্চপুর গ্রাম থেকে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন ও এই বাড়িতে দুর্গা পুজার প্রবর্তন করেন।

বর্তমানে ঠাকুরের সাদা মূর্তি আসে কুমোরটুলি থেকে কাঁধে চেপে এবং তাতে রঙ পড়ে এই ঠাকুরদালানেই। যদিও অতিমারীর প্রকোপে এখন রঙের কাজ শেষ করেই মূর্তি নিয়ে আসা হয়েছে ট্রাকে করে, আশ্বিন মাসের পুষ্যা নক্ষত্রের দিনে। কুমোরটুলিতেই কাঠামো পুজো হয় জন্মাষ্টমীর দিন। মূর্তিশিল্পীও বংশপরম্পরায় এই বাড়ির দুর্গামূর্তি বানিয়ে আসছেন। আগে করতেন মৃৎশিল্পী প্রদীপ পাল আর বর্তমানে ওনার সুযোগ্য কন্যা মীনাক্ষী পাল এই দায়িত্ব নিয়েছেন।

পুজোর সূচনা হয় তিথি অনুসারে পঞ্চমী অথবা ষষ্ঠীর দিন দেবীর বোধন দিয়ে। আজকের দিনেও পুজোয় ব্যবহৃত সমস্ত প্রদীপের সলতে ও ধূপ বানানো হয় বাড়িতে। এর মধ্যে ৩৬৫টা তুলো থেকে সুতো বের করে সরু করে পাকিয়ে আড়াই প্যাঁচের সলতে বানানো হয় যেগুলি দিয়ে অষ্টমীর আরতির সময় ৩৬৫টি প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়। এই প্রদীপগুলি বছরের ৩৬৫ দিনের সন্ধ্যাবাতির প্রতীক, কোনও কারণে কোনও সন্ধ্যায় বাতি না পড়লে যাতে বিঘ্ন না ঘটে। এঁদের সন্ধিপুজোর রীতি নেই। কথিত আছে যে অতীতে এক পুজোয় পূর্বপুরুষের কোনও গুরুদেব দেহত্যাগ করেন সন্ধিপুজোর কালে, সেই থেকেই বন্ধ হয়ে যায় এই রীতি। তবে সেই সময় একটি বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়, কল্যাণী পুজো, বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের কল্যাণ কামনার উদ্দেশ্যে। দেবী দুর্গা পূজিত হন কন্যা রূপে, আছে কনকাঞ্জলি ও কুমারী পুজোর প্রচলন। অব্রাহ্মণ বাড়ি তাই অন্নভোগের পরিবর্তে হয় শীতল ভোগ। ভোগের লুচি, মিষ্টি ব্রাহ্মণ দ্বারা তৈরি হয় বাড়িতেই। ধান কুটে চাল বের করে হয় দেবীর অর্ঘ্য।

সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন হল অষ্টমী। কল্যাণী পুজোর সাথে সাথে সধবা পুজো, ধুনো পোড়ানো হয় ওইদিনই। প্রতিমার অলঙ্করণ হয় সাদা ডাকের সাজে। একবারই শুধু ১৫০ বছরের পুজোয় সোনালী সাজ পরানো হয়েছিল মাকে। পিতলের তৈরি দেবীর অস্ত্রশস্ত্র রাখা থাকে বাড়িতেই।

কথার ফাঁকেই আবির্ভাব সেই ক্ষুদে জ্ঞানী ব্যক্তির।

“এ হল এই বংশের সপ্তম বংশধর, জানেন তো?”

দেখে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর রুকুর কথা মনে পড়ে যায়। দেবমাল্য ঘোষ। ক্লাস সেভেন, বুদ্ধিদীপ্ত দুটি গভীর চোখ। তারই কাকিমার থেকে শোনা গেল পুজো বিষয়ক কিছুতে বা ঠাকুর গড়ায়, হাতের কাজে ওর দক্ষতার কথা। মুহূর্তে আমাদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে দেবমাল্য। ওর কাছ থেকে জানা হয় ভারি ইন্টারেস্টিং কিছু তথ্য।

“জানো তো, আমাদের যে মতে পুজো হয় তাতে দেবী দুর্গা, দেবী সরস্বতী ও দেবী লক্ষ্মীকে ত্রিদেবী ধরা হয়, একই দেবীর তিন রূপ। তাই এঁদের একটাই বাহন সিংহ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর আলাদা বাহন নেই। কার্তিক, গণেশের কিন্তু আছে। লক্ষ্মীর হাতের পদ্মটি মোমের তৈরি। পদ্মের ব্যবহার কিন্তু পৌরাণিক অর্থে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দেবী দুর্গাও এখানে পদ্মাসনা। আর এই যে মটচৌড়ি চালার সামনে মুর্তির বিন্যাস দেখছ, তাতে কার্তিক আর তার উপর সরস্বতী হল সৃষ্টির প্রতীক, বাঁদিকে গণেশ আর তার ওপর লক্ষ্মী হল স্থিতি আর দেবী দুর্গা প্রলয়।”

একসাথে এতগুলো কথা বলে থামল দেবমাল্য। আমরা মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন।

সন্ধ্যে হয়ে আসছে। গোধূলির হালকা আলোয় শুনলাম দেবীর বিসর্জনের গল্প। এঁদের সিঁদুর খেলার প্রচলন নেই। এঁয়োরা বরণ করার পর, মা কাঁধে চেপে কৈলাস পথে রওনা হন। বাড়ির ছেলেরা সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত হয়ে চামড় করতে করতে এগিয়ে দিয়ে আসেন মা কে। ফিরে উঠোনে সবার একসাথে শান্তির জল গ্রহণ, প্রণাম ও বিজয়ার কোলাকুলি।

এতক্ষণ কেমন যেন পুজোর আবহে আবিষ্ট ছিলাম। এবার আমাদেরও ফেরার পালা। ভাবছিলাম যে দেশের দর্শন এত সমৃদ্ধ, যেখানে এভাবে পূজিত হয় নারী শক্তি শুধু নয়, তার সত্ত্বা, উদযাপিত হয় সৃষ্টি সেখানে কোথা থেকে যে আসে এত ভেদাভেদ, এত নারীত্বের অবমাননা?

যাই হোক, পূজোর সময়ে যাওয়ার আন্তরিক নিমন্ত্রণ নিয়ে বেড়িয়ে পরা গেল, দুগ্গা মায়ের দুর্গতিনাশিনী স্বরূপ প্রকাশিত হোক বারবার, এই আশা নিয়ে। পড়ন্ত বেলার আলোয় ঘোষ বাড়ির প্রতিমার মুখে তখন সমাহিত স্থৈর্য।

Copyright © Kothabriksha 2021, All Rights Reserved.

Adhunik Bangla Gan Ambika Ghosh benaras Bengal bengali short story coronavirus Dakshinee dreams Durga Puja Emotions folk culture Himalaya History of Indian Music India indian politics Kashmir Kobita kolkata kothabriksha kothabriksha editorial lockdown Music Nature nilimesh ray Pratyay Pratyay Raha pritam chowdhury pujo shonkhya Rabindranath Rabindranath Tagore Rabindrasangeet Religion Sayandeep Paul sharodiya shonkhya shortstory society Srabanti Sen Stories Subha Guha Thakurta Sustainable Travel Suvo Guha Thakurta Theatre travel west bengal World Environment Day

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.