বর্ধমানে দেবী বহুলাক্ষী – একান্ন সতীপীঠের অন্যতম

– প্রীতম চৌধুরী

পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কেতুগ্রামের দক্ষিনডিহি গ্রামের একটি ছোট মন্দির, বহুলা বা বহুলাক্ষী দেবীর মন্দির। যা কিনা ৫১ সতীপীঠের অন্যতম পীঠ হিসেবে পরিচিত।

দক্ষ ভবনে শিবের নিন্দা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন সতী। মহাদেব সেই দুঃখ সইতে না পেরে উন্মাদ হয়ে যান, এবং নিজের জটা ছিঁড়ে বীরভদ্র ও ভদ্রকালীকে উৎপন্ন করেন। তাঁরা মহাদেব এর আদেশ মতো দক্ষকে বধ করতে যান। এদিকে, মহাদেব সতীর দেহ নিয়ে তান্ডবনৃত্যে উদ্যত হলে, নারায়ণ সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেন। সেই দেহ-খন্ড পৃথিবীতে যে যে স্থানে পতিত হয় তাতে এক একটা সতীপীঠ গড়ে ওঠে। স্বয়ং মহাদেবও সেই শক্তিপীঠগুলোর রক্ষক হিসেবে ভৈরব রূপে প্রত্যেক সতীপীঠে বিরাজমান।

দেবীপীঠ তন্ত্র মতে,
“বহুলায়াং বামবাহু বহুলখ্যা চ দেবতা।
ভীরুকঃ ভৈরবস্তত্রঃ সর্বসিদ্ধিপ্রদায়ক॥

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে বলেছেন,
“বাহুলায় বামবাহু ফেলিলা কেশব।
বাহুলা চণ্ডীকা তাহে ভীরুক ভৈরব॥ “

কাটোয়া স্টেশনে নেমে, পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথে বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে কেতুগ্রাম এর বাসে চেপে, কেতুগ্রাম পৌঁছতে সময় লাগে আধ ঘন্টা। বাস স্টপে নেমে টোটো করে মন্দির পৌঁছতে সময় লাগে ১০ মিনিট।

পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মন্দির প্রাঙ্গণ। দেবীমূর্তি এখানে কিঞ্চিৎ অন্যরকম। কালো কষ্টিপাথরে খোদাই করা মূর্তি, উচ্চতা আনুমানিক সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট। ইতিহাস বলে, রাজা চন্দ্রকেতু এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সেনযুগের (মতান্তরে পালযুগের) এক স্থানীয় রাজা ছিলেন, যাঁর নামে জায়গার নাম কেতুগ্রাম। তার আগে গ্রামের নাম ছিল ‘বহুলা’। তাই, অনুমান করা যায়, মূর্তিটি সেন যুগের স্থাপত্যের একটি অনবদ্য নিদর্শন।

দেবী এখানে চতুর্ভুজা দুর্গা। তবে, কাপড়ে ঢাকা থাকায় পুরো মূর্তি দেখা যায় না। যেটি দেখা যায়, সেটি হল একটি অভিনব অষ্টভুজ গণেশ, যা কিনা বিরল। ভারতে কেবল কিছু মন্দিরেই এই অষ্টভুজ গণেশ মূর্তি রয়েছে।

দেবীর নিত্যপূজা ও সেবা স্থানীয় রাও বা রায় পরিবারের লোকেরা করেন। এছাড়াও মন্দির কমিটি রয়েছে, যাদের তত্ত্বাবধানে বাৎসরিক পুজোর আয়োজন করা হয়। শারদীয়া দুর্গোৎসব এই মন্দিরের প্রধান উৎসব। এখানে যে কোনো দিন মানত করে ছাগবলি দেওয়া যায়, তবে কেবল শারদীয়া মহানবমীর দিন মহিষ বলির রীতি রয়েছে। এছাড়াও চৈত্রের গাজন ও দোল এই মন্দিরের বিশেষ উৎসব। কেতুগ্রাম থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে শ্রীখন্ডে দেবীর ভৈরব ভীরুক অবস্থান করছেন।

পুরাণ ইতিহাস নয়। তবে পুরাণগ্রন্থগুলি, তাঁদের পূর্বসূরি বেদ-উপনিষদের ন্যায় জীবনচর্যা ও জীবনজিজ্ঞাসার পথ বলে দেয়। ধর্ম – অর্থ – কাম – মোক্ষ এই চতুর্বর্গ লাভের দিশারী, আমাদের প্রাচীন গ্রন্থাবলি আজ ভুল ভাবে অনূদিত ও গৃহীত। তাই, ধর্ম আর Religion এর পার্থক্য আজ আর মানুষ বোঝে না।

ফিরে আসা যাক পুরাণে। সতীর দেহত্যাগে শিব কেন এত ক্রোধিত হলেন? শুধু কি স্ত্রী বিয়োগে, নাকি এতেও স্বর্গের রাজনীতি রয়েছে? শিবপুত্র ছাড়া, তারকাসুর বধ সম্ভব নয়। তাই, মহাদেব কে বৈরাগ্য ছেড়ে গার্হস্থ্য যাপন করতে হবে, এমনই সিদ্ধান্ত স্বর্গের Cabinet -এর। কিন্তু, কে হবেন তাঁর সন্তানের জননী? কেই বা আছেন যিনি শিব-বীর্য ধারণ করতে সক্ষম। দেবী আদ্যাশক্তি। কিন্তু, যিনি স্বয়ং প্রকৃতি, যিনি এই বিশ্বের চালিকাশক্তি, তিনি তো বিমূর্ত, চিন্ময়ী।

ঋকবেদ এর দেবীসূক্তে অনুযায়ী, দেবী বলছেন ―

“আমারই দ্বারা সকলে আহার ও দর্শন করে, শ্বাস-প্রশ্বাসাদি নির্বাহ করে এবং উক্ত বিষয় শ্রবণ করে”

দক্ষ প্রজাপতি (ব্রহ্মার পুত্র ও বিষ্ণুর উপাসক) আদ্যাশক্তির সাধনা করে তাঁকে কন্যারূপে প্রাপ্ত করেন। এর সাথেই হতে হবে সদাশিবের বিবাহ, জন্ম নেবে ‘কুমার’, যে বধ করবে তারকসুরকে। তাই, কার্যসিদ্ধির আগেই, সতীর দেহত্যাগ এর ফল শুধুমাত্র মহাদেবের স্ত্রী-বিয়োগগত দুঃখ নয়, মর্ত্যে তারকাসুরের অত্যাচার বৃদ্ধিও বটে।

শিবশক্তির এই অপূর্ণ মিলন পূর্ণতা পাবে ঠিকই কিন্তু তার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। অপরিণত আদ্যাশক্তি ‘সতী’-র পর, পরিণত আদ্যাশক্তি ‘পার্বতী’ আসবেন শিবের জীবনে। যিনি নিজেকে শিবপত্নী হওয়ার যোগ্য করে তুলতে, নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলে তিলোত্তমা হবেন। তপস্যারত অবস্থায় একটি পর্ণও ভক্ষণ না করে ‘অপর্ণা’ হয়ে উঠবেন। সেই মিলন জীবনের নতুন সংজ্ঞা রচনা করবে। গার্হস্থ্যে বৈরাগ্যযাপন। স্ত্রী সন্তানাদি নিয়ে, শিব হয়ে উঠবেন, ভোলা মহেশ্বর।

Copyright Kothabriksha 2014, All Rights Reserved

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.