খেলা খেলা দিয়ে শুরু, খেলতে খেলতে শেষ – প্রত্যয় ও প্রীতম 

“বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রথম ১০০ জনের মধ্যে আমি কোনোদিনই আসব না” নিজের নানা সাক্ষাৎকারে অকপটে জানিয়েছেন পরিচালক। তা নাই আসতে পারেন, তার সিনেমা অনেকের কাছে সিন্থেটিক, উচ্চ মধ্যবিত্ত ‘সফিস্টিকেশন’ এর ন্যাকামি হলেও, বাঙালি নিজের পিঠ চাপড়াতে বরাবরের মতই উদাসীন। কারণ, বাঙালি ভুলে গেছে, কান-বার্লিন আবার বাংলা ছবি দেখানোর রেওয়াজ টা মজবুত করেছিলেন ‘তাসের ঘর’ এর ঋতু।

ইন্দ্রানী পার্ক এর একলব্য আর বিশপ লেফ্রয় রোড এর দ্রোনাচার্য এর বরাবরের প্রিয় বিষয়, মধ্যবিত্ত বাঙালি ও তাদের সম্পর্কের জটিল দিক। সেকারণে, ঋতুপর্ণ যেমন সত্যজিতের ছবিকে কে মধ্যবিত্ত বাঙালির সফল advertisement feature বলতে দ্বিধা করেন না, তেমনই আরেক সত্যজিৎ ঘরানার পরিচালক অপর্ণা সেনও বলতে দ্বিধা করেন না, সত্যজিৎ যেখানে শেষ করেন, সেই ধারা কে ঋতু এগিয়ে নিয়ে যান।

কিন্তু, ঋতুপর্ণের ছবিতে সত্যজিৎ ছাড়াও, তার নির্মাণ ও নৈপুণ্যে বারবার যিনি ফিরে আসেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। শুধু সংগীতে বা কবিতায় নয়, ছবির দৃশ্যকল্প নির্মাণ এ রবীন্দ্রনাথ এর এক একনিষ্ঠ অনুরাগী ঋতুপর্ণ আমাদের কাছে ধরা দেয়। ফিরে আসার বহু কারণের মধ্যে একটা হলো একটা ‘Radical World View’, এবং নিজের শিল্পের মধ্যে সেই বৈপ্লবিক দর্শন কে নিয়ে আসা খুব একটা সহজ নয়। অনেকেই চেষ্টা করেছেন, হয় খুব গোদা বিপ্লব হয়েছে যা কালের নিয়মে হারিয়েছে অথবা এমনই পেলব কিছু হয়েছে যা নিজের সময় কে অতিক্রম করতে পারেনি। তবে ঋতুপর্ণ দেখিয়েছেন কি করে সূক্ষ্ম ভাবে ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যে দিয়ে একটা বক্তব্য রাখা যায়।

‘উৎসব’ এ কেয়া যখন মায়ের কাছে গিয়ে বসে এবং মায়ের কাছে বাবার গল্প শোনে, ওর থেকে বড় বিপ্লব মনে হয় আর হয়না, মা বাবার কথা বলতে বলতে বলছেন, ‘ঢাকি ঢাক বাজাচ্ছে, ঠাকুর থাকবে কতক্ষন, আমি শুনছি, বন্দে মাতরম’। অনেক বছর কেটে যাওয়ার পর ও যে পুরোনো প্রেম জ্বলজ্বল করে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো জ্বলে উঠতে পারে এবং তাতে যে কোনো ভুল ঠিক এর ব্যাপার নেই তা আমরা দেখতে পাই যখন পারুল নিচে গিয়ে শিশিরের সাথে দেখা করে। আবার ‘দোসর’ এ, স্বামীর এত বড় ভুল কে স্বীকার করে তাকে ক্ষমা করে, ভালোবেসে, অনেক অভিমান, না বলা কথা, রাগ দুঃখ, ঝগড়ার পরও যে এই ভাবে কাছে টেনে নেওয়া যায়, এটা বিপ্লব নয়? ঋতুপর্ণ দেখিয়েছেন যে ক্ষমার আর এক নাম বিপ্লব। এই ভাবে বাংলা ছবি আগে কখনো উন্মুক্ত হয়নি।

দহনের ৯ নম্বর গল্ফক্লাব রোড, আর স্ত্রীর পত্রের মাখন বড়াল লেন, চিত্রাঙ্গদার হাসপাতালের জানলা আর ডাকঘরের অমলের জানলা। নিঃসঙ্গ শিলাইদহের রবীন্দ্রনাথ যেমন দূরে সানাইএর শব্দে আকুল হয়ে ওঠেন, তেমনি ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের এক দম্পতি দূরে পাড়ার ক্লাবে বাজতে থাকা মারোয়া-র সুরের সাথে নিজেদের সম্পর্কের বোঝাপড়া করে।

প্রথম ১০০ জন পরিচালকের তালিকায় ঋতুপর্ণ থাকবেন নাও হয়তো, তবে যতদিন বাংলা সিনেমা থাকবে, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এই লোকটাকে মনে রাখবে জাতীয় পুরস্কারের জন্য নয়, কিছু চমৎকার অভিনেতা তৈরি করে দেওয়ার জন্য। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে যীশু সেনগুপ্ত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত থেকে রাইমা সেন। যারা বলেন, ঋতুপর্ণ বম্বে থেকে শিল্পী নিয়ে আসেন, তারা অবশ্যই অসুখ, দহন, উৎসব, খেলা, আবহমান বা চিত্রাঙ্গদা দেখেননি। যেখানে শুধু actors নয়, non-actors দের দিয়েও কাজ করিয়েছেন পরিচালক।

বেঁচে থাকতে যে মানুষটার একমাত্র দুঃখ ছিল যে, বাঙালি তার যৌনতা নিয়ে এত আলোচনা করল, সিনেমা নিয়ে তত আলোচনা করল না। আজকে তাঁর জন্মদিনে আমরা তার সেই ক্ষোভ মেটানোর একটু চেষ্টা করলাম শুধু।

তুমি যে অধিকারে সবাইকে ‘তুই’ বলতে, আমরা সেই অধিকারেই তোমায় ঋতুদা বললাম।

কেন চলে গেলে এত তাড়াতাড়ি ? 

Copyright © Kothabriksha 2020, All Rights Reserved.

Pictures: The Hindu, The Times of India

Cover Picture: Kothabriksha

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.